আজ , , ,

বর্জ্য থেকে সম্পদ, শরীয়তপুরে মাছের আঁইশ প্রক্রিয়াজাতকরণে নতুন সম্ভাবনা

একসময়ের ফেলনা ও বর্জ্য হিসেবে গণ্য হওয়া মাছের আঁইশই এখন শরীয়তপুরের গ্রামীণ নারীদের ভাগ্য বদলের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসডিএস (শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি)-এর যৌথ অর্থায়নে জেলায় শুরু হয়েছে ‘মাছের আঁইশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন’ প্রদর্শনী প্রকল্প। এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় নারী ও বেকার যুবকদের জন্য তৈরি হচ্ছে এক নতুন কর্মসংস্থানের দিগন্ত। এ প্রকল্পের আওতায় শরীয়তপুর সদর উপজেলার রহিমা বেগমসহ তিনজনকে এই ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নগদ অর্থ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, স্থানীয় বিভিন্ন বাজার থেকে মাছ কাটার পর ফেলে দেওয়া আঁইশগুলো বিনামূল্যে সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেগুলো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পানিতে নিখুঁতভাবে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে গুদামজাত করা হয়। নামমাত্র খরচে ঘরোয়া পরিবেশে এই প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব। শুকানো এই আঁইশগুলো স্থানীয় পর্যায় ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে ভালো মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছের আঁইশ বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত মূল্যবান শিল্প কাঁচামাল। আঁইশ থেকে প্রাপ্ত কোলাজেন ও গুয়ানিন লিপস্টিক, স্কিন কেয়ার ক্রিম এবং অ্যান্টি-এজিং পণ্যে উজ্জ্বলতা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। ওষুধ শিল্পে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণে ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরিতে এর ব্যবহার রয়েছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে কৃত্রিম কর্নিয়া এবং সার্জিক্যাল সুতা তৈরিতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী। মাছ ও পোল্ট্রির উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য তৈরিতেও আঁইশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
সাধারণত মাছের আঁইশ বাজারে বা যত্রতত্র পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং পরিবেশ দূষণ করে। এই বর্জ্যকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলায় একদিকে যেমন পরিবেশ সুরক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে শক্তিশালী হচ্ছে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতির ধারণা। পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্বল্প পুঁজিতে অধিক আয় করতে সক্ষম হচ্ছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ঘরকন্না সামলানো নারীরা এখন আয়ের মুখ দেখছেন। নারী উদ্যোক্তা রহিমা বেগম বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে বাজারে মাছ কাটে। আগে মাছের আঁইশগুলো আমরা ফেলেই দিতাম, এগুলো যে বিক্রি করা যায় তা জানতাম না। এসডিএস-এর পরামর্শে এখন এই আঁইশ প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছি এবং আমরা খুব ভালো আছি।
অনুরূপ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে ইয়াসমিন নামে আরেক নারী উদ্যোক্তা জানান, আগে তারা শুধু ঘরের কাজই করতেন। এখন ফেলে দেওয়া আঁইশ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করছেন, যা তাদের সংসারে সচ্ছলতা এনে দিয়েছে।
এসডিএস-এর মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, পিকেএসএফ-এর অর্থায়নে গ্রামীণ নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। মাছের আঁইশ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নারীরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেমনি পরিবেশ দূষণও কমছে।
সংস্থার সহকারী কো-অর্ডিনেটর মোঃ মাহবুব আলম জানান, ফেলে দেওয়া আঁইশ কীভাবে প্রক্রিয়াজাত ও বিক্রি করতে হয়, সে বিষয়ে তারা উদ্যোক্তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নারীদের ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই এই প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, মাছ কাটার সাথে জড়িতরা আগে আঁইশ ফেলে দিত। এখন তারা সচেতন হয়ে এটি প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরোক্ষভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Share this news as a Photo Card


১৩ অক্টোবর ২০২৬

গ্যাস-বিদ্যুৎসহ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন: বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ

www.hongkar.com |
dailyhongkar