২৫টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) উদ্যোক্তাদের নিয়ে আশ্বাসের মানবপাচার বিষয়ক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস) এর বাস্তবায়নে, সুইজারল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে, উইনরক ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় ‘আশ্বাস প্রকল্প’-এর আওতায়, মানব পাচারের শিকার হয়ে ফিরে আসা নারী ও পুরুষদের জন্য করণীয় শীর্ষক সমন্বয় সভা ইউডিসিদের জন্য আয়োজন করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি এইডিএস এর কনফারেন্স রুমে এই সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সমন্বয় সভায় বক্তারা বলেন, আশ্বাস প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো মানবপাচার প্রতিরোধে স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা। ইউডিসি উদ্যোক্তারা তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সচেতনতা ছড়াতে পারেন। “গ্রামের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র নারী-পুরুষ প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে বিদেশে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হন। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারা জনগণের সবচেয়ে কাছের সেবা প্রদানকারী হিসেবে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।”
এই সময় ‘আশ্বাস প্রকল্পর প্রোগ্রাম অফিসার কামরুল হাসান ইউডিসিদের স্লাইড প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে মানবপাচারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন, তিনি বলেন, ভূয়া বিজ্ঞাপনের ফাদে পা দিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে পরছে। টিকটক ও লাইকির মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লোভ দেখানো ফাদের মাধ্যমে নারীদের ফাদে ফেলা হচ্ছে। নারীদেরকে বলা হয় ওদের জন্য সুন্দর সুন্দর চাকরি রয়েছে, এই চাকরিতে তোমাদের তেমন কোন যোগ্যতা লাগবে না। এসব কথা বলে তাদেরকে বড় একটি অ্যামাউন্ট এর অর্থ লোক দেখানো হয়। পরে তাদেরকে বর্ডারের মাধ্যমে স্থল, জলজ ও আকাশপথে অন্য দেশে নিয়ে পাচার করানো হয়। পরে সেখানে তাদেরকে বিভিন্ন নিষিদ্ধ এলাকা সহ বিভিন্নভাবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এসব জায়গায় আমাদেরকে সচেতন হতে হবে।
নারীরা যেন ফাদে পা না দেয়, সেজন্য নারীদের সচেতন করার জন্য আশ্বাস কাজ করে যাচ্ছে। ইউটিসিদের এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তাহলে আমাদের আশেপাশে সবাইকে এই বিষয়ে সচেতন করতে পারেন। আর এরই অঞ্চলটি দারিদ্রতা এবং নদী ভাঙ্গনের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবন এলাকা হওয়ায় দালালদের প্রথম টার্গেট থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষের দারিদ্রতা আসে। এই সব মানুষ হতাশাগ্রস্থ থাকে। আর হতাশাকে কাজে লাগায় দালাল চক্র। মানুষের এই হতাশা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে, এই এলাকার নারী-পুরুষদের কে বেশি বেশি অর্থলোভ দেখিয়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্ররোচনা চালান।
তাই ইউডিসি পরিচালকদের অনুরোধ করতে চাই, যদি কখনো কেউ আপনাদের মাধ্যমে দেশের বাহিরে যাওয়ার জন্য কোন ডকুমেন্ট নিয়ে আসে, তাহলে আপনারা তো চেক করে দেখবেন, যার মাধ্যমে সে বিদেশে যাচ্ছে তার দেয়া ডকুমেন্টগুলো আসল কিনা।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা বলেন, আজকে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি অনুরোধ কাওকে অবৈধ পথে বিদেশে যেতে দিবেন না। আর যারা এইভাবে যেতে চায় তাদের বলবেন, অবৈধভাবে গিয়ে পরিবারকে বিপদে ফেলবেন না। এভাবে যারা যায় তারাই নির্যাতিত হয়। যারা বিদেশ যাবেন, তাদের দক্ষতা অর্জনের কোন বিকল্প নেই। দক্ষ হয়ে বিদেশে গেলে কাজ পেতে সুবিধা হয়। তাহলে বিদেশে গিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুড়তে হবে না। তখন আপনি ভালো থাকবেন, আপনার পরিবার ভালো থাকবেন।
সমন্বয় সভায় আশ্বাসের প্রকল্প ম্যানেজার জাকির হোসেন বলেন, আমরা বিদেশ ফেরতদের নিয়ে কাজ করি। কারন বড় একটা টাকা প্রদানের মাধ্যমে তারা বিদেশ যায়। যখন শুন্য হাতে তারা দেশে ফেরে তখন মানসিকভাবে ভেংগে পরে। কিন্তু পরিবার, সমাজের অনেকেই তাকে কটু কথা বলে। যার কারনে সে আরো ভেংগে পরে। তারা যেন ভেংগে না পরে তাই আমরা তাকে মানসিক সাপোর্ট দেই। প্রয়োজনে সাইকোলজিক্যাল ট্রীটমেন্ট ও করি।
সে যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারে এইজন্য আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। স্বাধীনভাবে নিজের ব্যবসা পরিচালনা করছে। আজ যারা ব্যবসা করতে চান না। যারা বিভিন্ন চাকরি করতে আগ্রহী। আগ্রহীদের যোগ্যতা অনুযায়ী আমরা চাকরিরও ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
দ্যা ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর প্রতিনিধি জাহিদ হাসান বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধে ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টারের পরিচালকদের গুরুত্ব অপিরীসীম। বয়স সংশোধনের মাধ্যমে শিশুদের পাসপোর্ট বানিয়ে বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। তাই কোন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে যেন বয়স সংশোধন করে কোন শিশুর বয়স যেন বাড়িয়ে না দেয়া হয়।
উইনরক ইন্টারন্যাশনাল এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী টিআইএম মাজহারুজ্জামান বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে কিন্তু মানবপাচার কারিরা সক্রিয়। যেহেতু আপনারা ইউডিসিরা ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় কাজ করেন। তাই আপনাদের ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই জন্য আপনাদের নিয়ে আমরা কাজ করে যেতে চাই। কারন।আপনারা একটি ইউপির আদ্যোপান্ত জানেন।
প্রধান অতিথি এসডিএস এর নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম বলেন, আপনাদের ইউডিসিদের অবদান আমরা নিতে চাই। তাহলে মানবপাচার প্রতিরোধের কাজ আরও সুগোম হবে। মানব পাচার আমাদের সম্মুখেই হচ্ছে। আমাদের আত্মীয় স্বজন দের মধ্যেই।কিন্তু বিভিন্ন জন্য বিদেশ পারী দিচ্ছে। আমাদের উচিত খবর নেয়া তারা বৈধভাবে যাচ্ছে নাকি অবৈধ ভাবে যাচ্ছে।
যারা অবৈধভাবে দালালদের মাধ্যমে বিদেশে যেতে চাচ্ছে আপনারা আপনাদের সেন্টারের মাধ্যমে তাদের সচেতন করতে পারেন। আর যারা প্রতারিত হয়ে বিদেশ থেকে ফেরত আসবেন তাদের তথ্য দিয়ে সহোযোগিতা করলে আমরা মানসিক সাপোর্টসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে সহজ হবে।
‘আশ্বাস প্রকল্পর প্রোগ্রাম অফিসার কামরুল হাসানের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসডিএস এ নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম। আরো উপস্থিত ছিলেন উইনরক রহঃবৎহধঃরড়হধষ এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী টিআইএম টিআইএম মাজহারুজ্জামান বলেন, পরিচালক (এমএফ) এসডিএস কামরুল হাসান বাদল ও সাংবাদিক সহ বিভিন্ন ইউনিয়নের ইউডিসিরা।