আজ , , ,

শরীয়তপুরে প্রথমবারের মতো বিদেশি ইঁদুরের খামার: প্রাণিবিদ্যার ছাত্রী থেকে হতে চান সফল নারী উদ্যোক্তা

খিলগাঁও মডেল কলেজ থেকে প্রাণিবিদ্যায় মাস্টার্স করেছেন ঢাকার খিলগাঁওয়ের মেয়ে লাবনী আক্তার। সাধারণত এই বিষয়ে পড়াশোনা করা অনেক শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে গবেষণা বা শিক্ষকতা করা, কিন্তু লাবনী বেছে নিয়েছেন এক ব্যতিক্রমী পথ। গৃহিণী ও দুই সন্তানের জননী হওয়া সত্ত্বেও তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালে মাত্র ১,৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন বিদেশি ইঁদুরের খামার, যা শরীয়তপুরে এই প্রথম। শরীয়তপুর সদর উপজেলার পৌর এলাকার ৪ নং ওয়ার্ডের তুলাসার গ্রামে লাবনীর এই খামার।
লাবনী ২০১৬ সালে বিয়ে করেন শরীয়তপুরের ডামুড্যার ছেলে মো. রাকিবকে। বিয়ের পর তিনি পুরোপুরি সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে মনের মধ্যে সবসময়ই ছিল স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছা। কিন্তু কীভাবে স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করা যায়, তা নিয়ে তিনি ভাবছিলেন।
একদিন ইউটিউবে দেখতে পান, বিভিন্ন ল্যাব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য বিদেশি সাদা ইঁদুরের প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। এখান থেকেই তার মাথায় আসে বিদেশি ইঁদুরের খামার করার চিন্তা। প্রাণিবিদ্যার ছাত্রী হওয়ায় তিনি জানতেন, ইঁদুর লালন-পালন তুলনামূলক সহজ এবং এটি গবেষণার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ইদুর পালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই গুগল ও ইউটিউব দেখে ইঁদুর পালনের সবকিছু শিখতে শুরু করেন লাবনী। কীভাবে ইঁদুরের বাসস্থান তৈরি করতে হবে, কোন পরিবেশে রাখতে হবে, কী খাওয়াতে হবে এবং রোগবালাই হলে কী চিকিৎসা দিতে হবে এসব নিজেই রপ্ত করেন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সুইজারল্যান্ডের জনপ্রিয় ইঁদুরের জাত ঝরিংং অষনরহড়-এর চারটি ইঁদুর নিয়ে তার খামারের যাত্রা শুরু হয়। স্বামী রাকিব ১,০০০ টাকা দিয়ে চারটি ইঁদুর এবং ৫০০ টাকা দিয়ে দুটি খাঁচা কিনে এনে দেন। অক্টোবরে ইঁদুরগুলো প্রথমবার ১০টি বাচ্চা দেয়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে ৪০টি প্যারেন্ট ইঁদুর প্রতি মাসে প্রায় ২০০টি বাচ্চা দেয়। যা তিনি মূলত গবেষণাগার এবং অন্যান্য খামারে বিক্রি করেন।
পাশাপাশি পরিবারের পুষ্টি চাহিদার জন্য দেশ-বিদেশীর ৩ প্রজাতির ১৭টি মুরগি পালন করেন।
এই বিষয়ে লাবনী হুংকার কে বলেন, ইঁদুরের প্রথম ক্রেতা ছিলেন নারায়ণগঞ্জের এক সাপের খামারি। ইউটিউবে সাপের খামার সম্পর্কে একটি ভিডিও দেখে তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথম দফায় তিনি ২০টি ইঁদুরের বাচ্চা প্রতিটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন। এরপর ধীরে ধীরে তার ব্যবসা বাড়তে থাকে।
বর্তমানে পেরেন্টস ও বাচ্চা ইঁদুর মিলিয়ে তার খামারে প্রায় ৩৫০ টি ইদুর রয়েছে। প্রতি মাসে তিনি ২০০টি ইঁদুরের বাচ্চা বিক্রি করেন, যার প্রতিটি ১০০ টাকা করে বিক্রি হয়। এতে তার মাসিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০,০০০ টাকা, যেখানে খাবার ও ওষুধ বাবদ খরচ হয় প্রায় ৫,০০০ টাকা। ফলে মাসিক লাভ হয় ১৫,০০০ টাকা।
তবে ইঁদুরগুলো সরাসরি গবেষণাগারে না গিয়ে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর হাত ঘুরে যায়, যার ফলে তিনি প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হন। মধ্যস্থতাকারীরা তার কাছ থেকে ১০০ টাকা দরে কিনে পরবর্তী পর্যায়ে প্রতিটি ইঁদুর ২০০-২৫০ টাকা দামে বিক্রি করে।
ভবিষ্যতে ইঁদুরের খামারকে আরও বড় করতে চান। তিনি চান, সরাসরি গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ইঁদুর সরবরাহ করতে, যাতে মধ্যস্থতাকারীদের বাদ দিয়ে ন্যায্য দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, “আমার স্বপ্ন হলো, শরীয়তপুরের আরও নারীরা যেন উদ্যোক্তা হতে পারে। আমি চাই, অন্য নারীরাও যেন কম পুঁজিতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।”
লাবনী মনে করেন, যদি শরীয়তপুরে ইঁদুর পালনের ওপর কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে তিনি আরও দক্ষতার সঙ্গে খামারটি পরিচালনা করতে পারতেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এবং খামারের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ পাওয়া গেলে তিনি তার উদ্যোগকে আরও বড় করতে পারতেন। তার মতে, এটি কেবল তার জন্যই নয়, বরং আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারত।
লাবনী বলেন, এই যাত্রায় আমার স্বামী ও শাশুড়ি সবচেয়ে বড় সহযোগী। তাদের সমর্থন ছাড়া হয়তো এতদূর আসা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি বিবাহিত নারীর স্বপ্ন পূরণে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি পরিবার পাশে থাকে, তাহলে নারীরা উদ্যোক্তা হয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইলোরা ইয়াসমিন, হুংকার কে বলেন, লাবনীর উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। “নারীরা তখনই সংসার ও কর্মক্ষেত্রের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, যখন তাদের পরিবার থেকে সহযোগিতা করা হয়। লাবনীর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে যেভাবে সমর্থন দিচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অনন্য।” আমিও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়েও আমার পরিবারের সহযোগিতার জন্যা সংসার ও কর্মক্ষেত্র সমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরও জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সব ধরণের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। লাবনী যদি আমাদের কাছে আসে, আমরা তাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করব, বলেন ইউএনও ইলোরা ইয়াসমিন।

Share this news as a Photo Card


১২ আগস্ট ২০২৬

ভেদরগঞ্জে প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ জাতীয় ফুটবলের প্রস্তুতি সভা

www.hongkar.com |
dailyhongkar