শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর তীর রক্ষা বাঁধ ও ওয়াকওয়ে জয়বাংলা অ্যাভিনিউর ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার হাতিরঝিলের সেতুর আদলে প্রশস্ত ওই সেতু নির্মাণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদীর তীর রক্ষা বাঁধের ওপর এমন একটি স্থাপনা দেখতে ভিড় করছেন মানুষ। দুই মাস আগে সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হলেও গত শনিবার সন্ধ্যায় তা উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম।
নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নড়িয়ার পদ্মার তীরবর্তী তিনটি ইউনিয়ন ও নড়িয়া পৌরসভার কিছু এলাকায় প্রবল নদীভাঙন ছিল। ওই সময় ভাঙনে অন্তত ২০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়, তিনটি বাজারের পাঁচ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পদ্মায় বিলীন হয়। সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। নড়িয়ার ভাঙন ঠেকাতে ২০১৯ সাল থেকে ‘নড়িয়া-জাজিরা পদ্মা নদীর ডানতীর রক্ষা বাঁধ’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ ও ১১ কিলোমিটার নদীর চর খনন কাজ করা হয়েছে। বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে প্রথমে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এরপর পাথর ও সিমেন্টের তৈরি ব্লক ফেলে ও ব্লক বসিয়ে নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
ওই বাঁধ ঘেঁষে চার কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। নড়িয়ার মুলফৎগঞ্জ বাজার থেকে সুরেশ্বর লঞ্চঘাট পর্যন্ত ওই ওয়াকওয়ের নামকরণ করা হয় জয়বাংলা অ্যাভিনিউ। এর পাশ দিয়ে ঝাউগাছসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের বসার জন্য বিভিন্ন স্থানে বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। নদীতে নামার জন্য প্রতি ৩০০ মিটার অন্তর সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। জয়বাংলা অ্যাভিনিউ আকর্ষণীয় করার জন্য টাইলস ও লাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে।
নড়িয়ার ওই জয়বাংলা অ্যাভিনিউ এখন পর্যটন এলাকায় রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে ঘুরতে আসেন। ওই স্থানকে ঘিরে রেস্তোরাঁ ও নানা ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
মুলফৎগঞ্জ বাজারের পাশ দিয়ে পদ্মা নদী থেকে একটি খাল প্রবাহিত হয়েছে। ওই খালের মুখে (পদ্মা নদীর তীরে) একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ঢাকার হাতিরঝিলের সেতুর আদলে ওই সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ১৬ মিটার দীর্ঘ ও ৮ মিটার প্রস্থের সেতুটি নির্মাণ করতে ২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে খালটির দুই কিলোমিটার অংশ খনন করা হচ্ছে। ওই অংশ দৃষ্টিনন্দন করার জন্য খালের দুই দিকে ব্লক দিয়ে সাজানো হয়েছে। ঘুরতে আসা মানুষদের বসে সময় কাটানোর জন্য বেঞ্চ বসানো হয়েছে। সেতুটিতে বিভিন্ন রঙের লাইট বসানো হয়েছে। ওই লাইটের আলোতে পদ্মা নদীর পানির সৌন্দর্য দেখতে মানুষ রাতেও সেতুতে ভিড় করছেন।
গোসাইরহাট শামসুর রহমান সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান কয়েকজন আত্মীয় নিয়ে শনিবার বিকেলে পদ্মা নদীর তীরে ঘুরতে আসেন। হাতিরঝিলের আদলে বানানো সেতু দেখতে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তিনি।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘নড়িয়ার পদ্মার তীরের কথা শুনলেই ভয় আর আতঙ্ক কাজ করত। নদীভাঙনে এখানকার মানুষ ছিল বিপর্যস্ত। উন্নয়নের ছোঁয়ায় আজ সেই আতঙ্কিত স্থান পর্যটন এলাকায় রূপ নিয়েছে। পদ্মার তীরে দৃষ্টিনন্দন সেতুটি দেখার আগ্রহ ছিল। ছুটির দিন হওয়ায় এসেছি। রাতের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়েছি। সেতুর বিভিন্ন রঙের আলোকচ্ছটা পদ্মার পানিতে দেখতে আরও মোহনীয় লাগে। সুন্দর একটি সময় কাটিয়েছি।’
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শংকর চন্দ্র বৈদ্য বলেন, নড়িয়ার পদ্মা তীর রক্ষা বাঁধ জয় বাংলা অ্যাভিনিউতে মানুষ বেড়াতে আসছেন। দৃষ্টিনন্দন সেতুটির কারণে সেই ভিড় আরও বেড়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নজরে রাখার জন্য নড়িয়া পৌরসভা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে যুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেন, ‘নড়িয়ার নদীভাঙন রোধ করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায় ১০ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও ১১ কিলোমিটার নদী খনন করার মধ্য দিয়ে আমরা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। গত চার বছরে এখানকার একটি বাড়িও ভাঙনের কবলে পড়েনি। এখন তীর রক্ষা বাঁধের ওপর হাজারো মানুষ ঘুরতে আসছেন। পর্যটকদের বিনোদন ও আকৃষ্ট করতে আমরা নানা ধরণের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণ করে জয়বাংলা অ্যাভিনিউর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার কাজ করছি। পদ্মা সেতু থেকে তারাবুনিয়া পর্যন্ত নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ৩০ কিলোমিটার এলাকাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।