বৃহস্পতিবার, ১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১লা শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরি
বৃহস্পতিবার, ১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শিশু শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগে অধ্যক্ষ আমির হামজা পুলিশের হাতে আটক

শিশু শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগে অধ্যক্ষ আমির হামজা পুলিশের হাতে আটক
জাজিরা থানা পুলিশের হাতে আটক শিশু ধর্ষণে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ আমির হামজা। ছবি-দৈনিক হুংকার।

স্থানীয় সালিশির মাধ্যমে জরিমানা দিয়েও বাঁচতে পারলেন না কওমী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি আমির হামজা। নির্যাতিত শিশুর পিতার দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত আমির হামজাকে গ্রেফতার করেছে।
গত ১৩ এপ্রিল শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মাঝিরঘাট সংলগ্ন পাইনপাড়ায় অবস্থিত বায়তুল জান্নাত মহিলা মাদ্রাসায় এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে আজিজ শেখের ছেলে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পক্ষে পড়ে কোন রকম থানা পুলিশ কিংবা আইনের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় সমাজপতিরা নির্যাতিত মেয়েটির পরিবারকে জিম্মি করে সম্ভ্রমের বিনিময়ে তিন লাখ টাকা দেওয়ার দফারফা করে সমাজের মাতুব্বরেরা। সমাজের মাতুব্বরদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না নির্যাতিতার পরিবারের কেউ।
ঘটনার ৩ দিন পর সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) সকাল ৭টার দিকে বায়তুল জান্নাত মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আমির হামজা মাদ্রাসারই ৯ বছর বয়সী নাজেরানা বিভাগের এক শিশু ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। ভূক্তভোগীর পরিবার আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে চাইলে স্থানীয় মাতুব্বররা সেটা করতে দেননি। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সমাজপতি মাতুব্বররা ১৫ এপ্রিল বিকেলে সালিশ দরবার করে অধ্যক্ষ আমির হামজাকে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা ও দশ ঘা জুতাপেটার নির্দেশ প্রদান করেন।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে কিশোরীর বাড়ি গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মা জানান, মেয়ে বাড়ি নাই। আমাদের তো এলাকায় থাকতে হবে। বিষয়টি এলাকার পাঁচজন মিটমাট করে দিয়েছে। আমি ওর বাবার সাথে কথা না বলে আপনাদের কিছু জানাতে পারব না। যে মিটমাট হয়েছে তাতে আপনারা কি ধরণের বিচার পেয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাক ছিলেন যৌন নির্যাতনের শিকার কিশোরীর মা। তবে মেয়েটির দুলাভাই পরিচয়ে একজন জানান, ঘটনা সত্য। আপনাদেরও মা বোন আছে, বিষয়টি নিয়ে আপনারাও চুপচাপ থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূক্তভোগীর এক প্রতিবেশী বলেন, মাতুব্বররা গতকাল বৃহস্পতিবার এলাকায় দরবার সালিশ করে বিষয়টি মিটমাট করে দিয়েছেন। তারা নদীর ওপাড়ে মঙ্গল মাঝির ঘাটে আছেন, সেখানে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলুন।
বায়তুল জান্নাত মহিলা মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায় মাদ্রসাটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে, জানা যায় এলাকার মাতুব্বররা ছয় মাসের জন্য মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দিয়েছেন।
অধ্যক্ষ আমির হামজার বাড়ি গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার বড় ভাই মনির হোসেন জানান, শয়তানের ধোকায় পড়ে আমার ভাই একটি ভূল কাজ করে ফেলেছে, এলাকার মাতুব্বররা দরবার সালিশ করে বিষয়টি মিমাংসা করে দিয়েছেন। লজ্জায় আমরা মুখ দেখাতে পারিনা।
সালিশ বোর্ডের এক সদস্য জানান, একটি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটছে। আমরা এলাকার প্রায় চার পাঁচশত মানুষের সামনে গ্রামের মাতুব্বর কালু মাঝি, রাজ্জাক মাঝি, বাচ্চু মাদবর, মোকলেছ মাদবর, লতিফ বেপারী, প্যানেল চেয়ারম্যান আজহার মুন্সীসহ স্থানীয়রা মিলে একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছি। তাতে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা ধার্য করে পঞ্চাশ হাজার টাকা মাফ করে তিন লক্ষ টাকা নির্যাতিতার ভবিষ্যতের জন্য অধ্যক্ষ আমির হামজাকে জরিমানা করেছি। এ সময় আমির হামজার ভাই দুলাল উত্তেজিত হয়ে সকলের সামনে আমির হামজাকে জুতাপেটা করেছেন।
এবিষয়ে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লালচাঁন মাদবর বলেন, ঘটনাটি আমি শুনেছি, আমারও সালিশিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অন্য একটি দরবার থাকায় আমি যেতে পারিনি, তবে আমি প্যানেল চেয়ারম্যান আজহার মুন্সীকে পাঠিয়েছি। কওমী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কর্তৃক শিশু ধর্ষণের মত একটি গুরুতর বিষয় আপনার প্রতিনিধিত্ব করে প্যানেল চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় মুরুব্বীরা মিমাংসা করতে পারেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেমনে কি করছে আমি জানি না।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মিন্টু মন্ডল বলেন, সংবাদ কর্মীদের কাছ থেকে আমি প্রথম জেনেছি। এরপর আমি রাতে ১টার দিকে অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত আমির হামজাকে গ্রেফতার করেছি। আসামী ধর্ষণের ঘটনা স্বীকার করেছেন। নির্যাতিতাকে মেডিকল পরীক্ষার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এঘটনায় নির্যাতিত শিশুটির জবানবন্দির ভিত্তিতে জাজিরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯/১/৩০ ধারায় নির্যাতিতের বাবা বাদী হয়ে মামালা দায়ের করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

মন্তব্য

দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।