সোমবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৯শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি
সোমবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান মেয়েটির নাম রাখলেন ‘মারইয়াম পদ্মা’

জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান মেয়েটির নাম রাখলেন ‘মারইয়াম পদ্মা’
নদীতে জন্মনেয়া শিশু ও মাকে জাজিরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপহার তুলে দিচ্ছেন নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান ভুইয়া।

(জাজিরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ফেসবুক পেইজ থেকে নেয়া হুবহু প্রকাশ করা হলো)
পবিত্র শবে কদর বিকেলে হঠাৎ জেলা প্রশাসকের ফোন পেয়ে আতকে উঠেন জাজিরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান ভুইয়া। তিনি বলেন কিছুটা ভয় এবং আতঙ্ক নিয়ে ফোনটি ধরলাম। স্যার বললো তোমাকে একজন সাংবাদিক ফোন দিচ্ছে কিন্তু পাচ্ছে না। একজন মেয়ে নাকি নদী পার হতে গিয়ে চরের মধ্যে আটকে পড়েছে এবং বাচ্চা প্রসব করেছে। তুমি তার সাথে আলাপ করে দেখো কিছু করতে পার কিনা।
সাংবাদিক আমার পরিচিত। তাকে ফোন দিয়ে ঘটনাটি শুনলাম। ইউএনও’র চাকরির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও স্ট্রেন্থ হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আমি তৎক্ষনাৎ এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বারকে ফোন করি এবং জানতে পারি এই চরের মুরব্বি আব্দুর রাজ্জাক মাঝি। তিনিও আমার পরিচিত। আমি তাকে ফোন করি এবং এই মুহুর্তে মেয়েটি কোথায় আছে জানাতে বলি। তিনি খবর নিয়ে আমাকে জানান যে মেয়েটিকে একজনের বাড়িতে নেওয়া হয়েছে এবং চরের মা-বোনেরা মেয়েটিকে সেবা দিচ্ছে। আমি তাকে সেখানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করি এবং মা ও নবজাতকের শারীরিক অবস্থা জানাতে বলি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানকে ফোন করে বিস্তারিত অবহিত করি এবং তার সহযোগিতা কামনা করি। আমার অফিস স্টাফদেরকে নবজাতক ও মায়ের জন্য জামাকাপড়, ফল, শুকনা খাবার, দুধ এবং মিষ্টি কিনতে বলি।
আমরা অনেকেই বোধ হয় জানিনা যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ৩৪ ধরণের ঔষধ পাওয়া যায় এবং সাধারণ প্রায় সকল ধরণের সেবা পাওয়া যায়। ডাঃ মাহমুদুল হাসান জনসেবায় আমার চেয়েও একধাপ এগিয়ে। তিনি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য সহকারী এমএ আক্কাস চৌকিদার এবং হাসপাতালের ওয়াটার এ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার ইমরানকে রাজ্জাক মাঝির সহযোগিতায় দ্রুত মা ও বাচ্চাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনার নির্দেশ দেন। ইমরান ও আক্কাস রোজা রেখে অভুক্ত থেকে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দ্রুততার সাথে রাজ্জাক মাঝিসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং মা-বাবা ও নবজাতককে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
আমি এবং ইউএইচএফপিও মাহমুদুল হাসান ইফতারি ও নামাজ শেষ করে হাসপাতালেই নবজাতক ও মার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তাদেরকে দ্রুত জরুরী বিভাগে চেকআপ করা হয় এবং ডাক্তারী পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
নতুন মা আমাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে বাচ্চার জন্য একটি নাম রাখার অনুরোধ করেন। আমি আকাশ-পাতাল ভেবেও কোন নাম ঠিক করতে না পেরে জেলা প্রশাসক স্যারের শরণাপন্ন হই। আমার মনে পড়ে যায় আমাদের প্রথম সন্তানের জন্মের সময় অনেক বই ঘাটাঘাটি এবং ৬ মাস চেষ্টা করেও আমি এবং আমার বউ সন্তানের নাম ঠিক করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। স্যার মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই মেয়ে বাচ্চাটির নামকরণ করেন ‘মারইয়াম পদ্মা’। নবজাতকের মা-বাবা আনন্দচিত্তে নামটি গ্রহণ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দসহ সকলকে নবজাতকের মঙ্গল কামনায় মিষ্টিমুখ করানো হয়। পরদিন মা-মেয়ের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকায় তাদেরকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গাড়ী ভাড়া করে মেয়ের মার বাড়ি বরগুনার আমতলীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন জেলা প্রশাসক স্যারকে বিস্তারিত অবহিত করার জন্য ফোন করলে স্যার বলেন, আমি খেয়াল করেছি, তুমি বাধ্য হয়ে নও আনন্দচিত্তেই কাজটি করেছ। তুমি এবং তোমার পুরো টিমকে অসংখ্য ধন্যবাদ। স্যারের কথাগুলো শুনে কাজের উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল।
আমি সাংবাদিক সুমনকে ধন্যবাদ জানাই আমাদেরকে সংবাদটি অবহিত করার জন্য। সকল গণমাধ্যম কর্মীদেরও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই সংবাদটি প্রচারের জন্য। আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই রাজ্জাক মাঝি, ডাঃ মাহমুদুল হাসান, এমএ আক্কাছ চৌকিদার সহ জাজিরা হাসপাতালের সকল ডাক্তার ও নার্সকে যারা আন্তরিকভাবে সেবা দিয়েছেন। ধন্যবাদ আমার সিএ বোরহান, গোবিন্দ পুটিয়া এবং ড্রাইভার মনিরকে তাদের উৎসাহ ও আন্তরিকতার জন্য।
অশেষ কৃতজ্ঞতা জেলা প্রশাসক মোঃ পারভেজ হাসান স্যারকে যিনি সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা ‘টীম শরীয়তপুর’ এভাবেই আপনার নেতৃত্বে ‘শাণিত শরীয়তপুর’ গঠনে ভূমিকা রাখতে চাই।
আমরা সবাই মিলে গড়ে তুলবো জনবান্ধব জনপ্রশাসন। আগামীর স্বপ্নের সোনার বাংলা। পরিশেষে একটি কথা। লকডাউনের এই সময়ে আমরা আর কেউ যেন এরকম বিপদজনক জার্নি না করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

মন্তব্য

দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।