রবিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪২ হিজরি
রবিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সংসার সংগ্রামী তাসলিমার এগিয়ে চলা

সংসার সংগ্রামী তাসলিমার এগিয়ে চলা
সংসার সংগ্রামী তাসলিমার এগিয়ে চলা

দুর্ঘটনায় স্বামীর দু’পা হারানোর পরে সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে ভিক্ষা না করে মাঠে ফসল কাটার কাজে নেমে আজ সফল দলনেত্রী তাসলিমা। তার প্রচেষ্টায় মুগ্ধ উপজেলা প্রশাসন, চায় তার পাশে দাঁড়াতে।
প্রায় ৩০ বছর পূর্বে গোসাইরহাট উপজেলার ইদিলপুর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের হাফেজ হাওলাদারের সাথে বিয়ে হয়েছিল তাসলিমা আক্তারের। আর দশ জন নারীর মতোই স্বপ্ন দেখতেন সুখে শান্তিতে সংসার করবেন, ছেলে-মেয়েদের বড় করে শিক্ষিত বানাবেন। কিন্তু তার কপালে তা সইল না। হঠাৎ একদিন স্বামী দুর্ঘটনায় পতিত হন। এতে অস্ত্রোপচার করে তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়। একমাত্র উপার্জনকারীর কর্মহীন হয়ে পরায় সংসারে নেমে আসে অভাব। এদিকে স্বামীর চিকিৎসা ব্যয় সব মিলিয়ে সহায় সম্বল একে একে হারিয়ে সর্বশান্ত।
উপায়ান্ত হীন তাসলিমা মনে মনে বিশ্বাস করতে “নবী শিক্ষা করোনা ভিক্ষা, মেহনত করে খাও” তাই তিনি প্রথমে একাই শুরু করেন মাঠে কৃষকের কাজ। এর পরে তিনি পর্যায়ক্রমে এ কাজে আরো ১৫/২০ জন অসচ্ছল বৃদ্ধা ও তরুণীকে সঙ্গী করেন। তার নেতৃত্বে গ্রামের ফসলি জমি থেকে অন্যের ধান কাটা, পাট ও মরিচ তোলাসহ বিভিন্ন ফসল কেটে ঘরে তুলে দেয়ার কাজ করে। প্রায় ২৫/২৬ বছর ধরে তাসলিমা ও তার দল এ কাজের মাধ্যমে ঐ এলাকায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করে বেঁচে আছেন।
৪ পুত্র ও ৫ কন্যার গর্বিত জননী তাসলিমা আক্তার বলেন, আমার স্বামী ৩০ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। তখন অপারেশন করে তার দুই পা কেটে ফেলা হয়। তারপর থেকে ঘরে বসে থাকেন আমার স্বামী। অভাব শুরু তখন থেকেই। কোনো কূলকিনারা না পেয়ে জমিতে পুরুষদের সঙ্গে আমিও ধান কাটি, মরিচ তুলি, পাট কেটে জাগ দিই, কইল, মসুরীতুলি। এতে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চালাই।
আমার দেখা দেখি আমাদের এলাকার অসচ্ছল পরিবারের নারী সদস্যরা তাদের সংসারের অভাব ঘুচাতে পুরুষের পাশাপাশি তারাও মাঠে কাজে অংশ নিচ্ছে। তিনি বলেন, আস্তে আস্তে আমি একটা দল গঠন করি। এই দলে প্রথমে সদস্য ছিল প্রায় ২০ জনের মতো। আমরা পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করেছি। এ ছাড়া অনেককেই বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে ফসলি জমিতে ফসল ওঠানোর জন্য পাঠাতাম। সেখান থেকে যা রোজগার হয় তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে।
সরকারের কাছ থেকে কোনো সুবিধা পান কি না, এমন প্রশ্নে তাসলিমা বলেন, আমার স্বামী কয়েক বছর ধরে বয়স্ক ভাতা পান। তাসলিমার সঙ্গে কাজ করতে আসা আনিসা খাতুন (৬৬) বলেন, আমি ২০ বছর ধরে এই দলের সঙ্গে কাজ করি। আমার স্বামী নেই। ছেলে আছে কিন্তু না থাকার মতোই। ভিক্ষা ছাড়া কোনো উপায় না দেখে তাসলিমার সঙ্গে আমি মাঠে কাজ করতে আসি। এখানে যা পাই, তা দিয়েই সংসার চালাই।
এই দলের হাবিবা খানম, সোহানা আক্তার ও বকুল বেগম বলেন, তাদের স্বামী অসুস্থ বা বেকার হওয়ার পর থেকে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কষ্ট করে জীবন চালাতেন। বিকল্প পথ হিসেবে মাঠে কাজ করছেন। যখন যেখানে কাজ পান, দলবেঁধে তারা চলে যান। যেমন আলু তোলার সময় মুন্সিগঞ্জে চলে যান। এভাবেই চলে তাদের জীবনযাপন।
স্থানীয় জালাল মাদবর (৬০) বলেন, তাসলিমার স্বামীর বাড়ি আমার বাড়ির পাশে ছিল। তার স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর থেকে নিজেই ছেলে-মেয়ে রেখে আমার সাথে মাঠের কাজে নেমে পড়েন। এ কাজ করে যা পান, তা দিয়েই সংসার চালান।
ইদিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন শিকারী বলেন, তাসলিমা বিয়ের পর থেকেই কাজ করেন। বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী দুর্ঘটনায় পা হারান। তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে তাকে সম্ভব সকল সহায়তা দিয়ে থাকি। এর পরেও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা বলে যদি সম্ভব হয় তবে সহায়তার ব্যবস্থা করে দেব।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে আমরা বিভিন্ন ধরণের ভাতা প্রদান করে থাকি। যদি সেসব খাতে তাদের জন্য কোনো সুযোগ থাকে, তাহলে অবশ্যই সহযোগিতা করে দেওয়া হবে। পল্লী সমাজসেবা কেন্দ্র ও পল্লী মাতৃকেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন ধরণের ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করে থাকি। যদি তিনি ঋণ নিতে আগ্রহী থাকেন, তাহলে একটি দল করে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করে দিব।
গোসাইরহাট উপজেলা মহিলা বিষয়ক (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা ফাতেমা নাহিয়ান বলেন, তাসলিমা একজন সংগ্রামী নারী। আমরা আয়বর্ধনমূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। যদি তারা এ ধরণের প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করতে চায়, তাহলে সুযোগ দেওয়া হবে। তাসলিমা এলাকার ১৫ থেকে ২০ নারীকে সংগঠিত করে একটি সমিতি করতে পারেন। তাহলে সেই সমিতির মাধ্যমে বর্তমান সরকারের দেয়া বিভিন্ন ধরণের সুবিধা পেতে পারেন।

 


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।