বুধবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ই রজব, ১৪৪২ হিজরি
বুধবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

চলে গেলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী জয়নুল হক সিকদার

চলে গেলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী  জয়নুল হক সিকদার
জয়নুল হক সিকদার। ফাইল ফটো।

শুধু শরীয়তপুর জেলাতেই নয় সমগ্র বাংলাদেশে যে ক’জন ব্যক্তিত্ব স্বীয় মেধা ও সাধনার ফলে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও শিক্ষানুরাগী হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন জয়নুল হক সিকদার তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সফল ব্যবসা উদ্যোক্তা, শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্ট সমাজসেবক। ১০ ফেব্রুয়ারী বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইন্তেকাল করেন।
জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবন ঃ কিংবদন্তী তুল্য কর্মবীর জয়নুল হক সিকদারের জন্ম ভেদরগঞ্জ উপজেলার কার্তিকপুর গ্রামে ১২ আগস্ট ১৯২৯ সালে। পিতা মরহুম মকফররুদ্দিন শিকদার। স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার রামভদ্রপুরের নজির আহমেদ এর কন্যা। এ সুখী দম্পত্তির পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে। সন্তানরা হলেন, নাসিম সিকদার, মনতাজুল হক, রিক হক, শহিদুল হক, রন হক, লিসা হক, এফ হক ও পারভিন হক সিকদার স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তারা সবাই প্রতিষ্ঠিত। মরহুম জয়নুল হক সিকদার আসামের গোয়ালপাড়ায় পিতার কর্মস্থলে শৈশবের শিক্ষা জীবন শেষে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি স্বদেশে চলে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া সেঞ্চুরী ইউনিভার্সিটি হতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার প্রাণ পুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সেখানে ব্যবসায় আত্ননিয়োগ করেন। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি সেখানে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে ঃ জয়নুল হক সিকদার মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ২৫ মার্চ গুঞ্জন চলছিল ঢাকা শহরে আজ মিলিটারী মার্চ করবে তখন জয়নুল হক সিকদার আরো লোকজন সহ ইপিআরটিসির বাসে চড়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে যান। বঙ্গবন্ধু বললেন “আমি যাব না, আমার যা করার দরকার তা আমি করব। তোমরা এই আসন্ন হামলাকে প্রতিহত করার জন্য যে যা করতে পারো করো”। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে ফিরে তিনি ১৫ নং রোডের সাত মসজিদ সড়কে একটি ব্যারিকেড তৈরী করি। রাত ১১ টার দিকে পাক সেনারা এসে ব্যারিকেড সরাতে থাকলো। ১৫ নং রোডের একটি বাড়ী থেকে ডাবল ব্যারেল বন্দুক দিয়ে আর্মিদের প্রতি ফায়ার করি। এতে দুই জন পাকসেনা ঘটনাস্থলেই মারা যান। অতঃপর তারা হামলা করলে তখন সেখান থেকে কায়দা করে বিভিন্ন স্থান ঘুরে রাত ১টার দিকে বাসায় আসলে একজন খবর দেন যে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে গেছে। ২৭ মার্চ ছাত্রনেতা নুরে আলম সিদ্দিকী, তাজউদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে রায়ের বাজার হয়ে নদী পার করিয়ে আটি পৌঁছিয়ে দেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনটি ট্রাক, একটি জীপ ভর্তি একজন কর্ণেলের নেতৃত্বে ১৫০ জন সৈন্য আমার বাড়ী ঘিরে তল্লাশি চালিয়ে বাথরুমের মধ্যে লুকিয়ে রাখা রাইফেল খুজে পায়। পাকসেনারা জিজ্ঞাসা করল “সিকদার কাহা, উয়ে মিসক্রিয়ান্ট কা লিডার হ্যায়”। এপ্রিলে আমি নিজ গ্রাম কার্তিকপুরে চলে যাই। জুনের মাঝামাঝি আমি দিদার (বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা) এর নেতৃত্বে ৮৭ জন লোক সহ ভারতের মালাগড়ে পৌঁছালে সেখানে কর্ণেল শওকত আলী, ২ নং সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশারফ ও ক্যাপ্টেন শওকতের সাথে সাক্ষাাৎ হয়। খালেদ মোশারফ ঢাকা গিয়ে যুদ্ধ করতে বললে আমি তাতে রাজি হননি। অবসরপ্রাপ্ত আর্মি, ইপিআর ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত আক্কাস বাহিনীর সার্বিক দায়িত্ব নিয়ে দেশেই মুক্তিযুদ্ধ করি। আমি ভেদরগঞ্জ, নড়িয়া ও ডামুড্যা থানা মুক্ত করার প্রতিটি লড়াইয়ে বিশেষ ভুমিকা রেখেছিলাম।
শরীয়তপুরে তার অবদান ঃ জয়নুল হক শিকদার সরাসরি রাজনীতির কোন পদ অলংকৃত না করলেও তিনি আড়ালে থেকে বাংলাদেশের স¦াধীনতায় নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন আওয়ামীলীগকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তারই কন্যা পারভীন হক সিকদার বর্তমান জাতিয় সংসদের শরীয়তপুরের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য। শরীয়তপুরের উন্নয়নে তিনি জেড.এইচ. সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ভেদরগঞ্জে মনোয়ারা সিকদার স্কুল ও কলেজ, কোদালপুরে মনোয়ারা শিকদার কলেজ, দিগরমহিষখালীতে মনোয়ারা শিকদার গার্লস হাইস্কুল, প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রামভদ্রপুর এর মনোয়ারা শিকদার মেডিকেল কলেজ, শামসুনাহার বালিকা বিদ্যালয়সহ মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
মরহুমের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ঃ জয়নুল হক সিকদারের রয়েছে বাংলাদেশে বিশাল ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান। ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক তিনি। তাঁর উদ্যোগে ১৯৯২ সালে ঢাকার রায়ের বাজারে জয়নুল হক সিকদার মহিলা কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি জয়নুল হক সিকদার মহিলা মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং তার নিজের টাকায় তিনি এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে থাকেন। প্রতিষ্ঠানটি তৈরির পিছনে তার উদ্দেশ্য ছিল ডাক্তারী শিক্ষার প্রতি মানুষকে সচেতন করা। সিকদার মহিলা মেডিকেল কলেজ থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার দেশী ও বিদেশী মহিলা ডাক্তার এমবিবিএস পাশ করে চিকিৎসা শাস্ত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এ হাসপাতালে দেশের প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারীর ব্যবস্থা করা হয়। ভারত সহ অন্যান্য দেশ হতে বিশেষজ্ঞ ডাক্টারগণের সহায়তায় এ হাসপাতালে বাই-পাস ও এনজিও গ্রাম সহ বিভিন্ন হৃদরোগের উন্নত মানের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। জয়নুল হক সিকদার ঢাকার গুলশানেও অনুরূপ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। জনাব সিকদার ঢাকাতে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ছাড়াও তারা পিতার নামে এমইউ ডিগ্রী কলেজ, মাতার নামে জরিনা শিকদার গার্লস স্কুল ও কলেজ, স্ত্রীর নামে মনোয়ারা শিকদার প্রাইমারী স্কুল, মিলেনিয়াম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। রায়ের বাজার হাসপাতালের অভ্যন্তরে জরিনা শিকদার ট্রাস্ট মসজিদ তার নির্মিত প্রতিষ্ঠান।
অধুনা তিনি সিকদার অর্গানিক মার্কেট ও সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী নামে দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তার মৃত্যুতে জাতি হারালো একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা ও সফল উদ্যোক্তাকে। আর শরীয়তপুরবাসী হারালো একজন অভিভাবককে। দৈনিক হুংকার পবিরারে পক্ষ থেকে তার বিদেহী অত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।