শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

পদ্মার ভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার গুলোর পুনর্বাসনের প্রয়োজন

পদ্মার ভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার গুলো তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন। ছবি-দৈনিক হুংকার।

নড়িয়া, জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীর ভাঙনে ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে।
হিসাব মতে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে পদ্মার ভাঙনে অন্তত ২০ হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। এখন তারা অন্যের জমিতে ছাপরা বানিয়ে বাস করছে।
তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন থেমেছে। তবে আগের ভাঙনের শিকার গৃহহীন পরিবারগুলো কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। পাঁচ বছরেও তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার ছাপরা ঘরে বাস করছে।
পদ্মা নদীর তীরে নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর, নড়িয়া পৌরসভা, কেদারপুর, ঘড়িসার, চরআত্রা ও নওপাড়া ইউনিয়ন অবস্থিত। ২০১৫ সাল থেকে নড়িয়ার বিভিন্ন এলাকা নদীভাঙনের কবলে পড়ে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভাঙনে অন্তত ২০ হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ভাঙন ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই বছরেই সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়। নদীতে বিলীন হয়েছে তিনটি বাজারের সাড়ে পাঁচশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আরও বিলীন হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনসহ তিনটি দ্বিতল ভবন। ২০১৯ সালে ভাঙন রোধে প্রকল্পের কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
১ হাজার ৯৭ কোটি টাকায় ৮ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ ও ১১ কিলোমিটার নদীর চর খননের কাজ শুরু হয়। ওই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। আর পদ্মা নদীর উত্তর তীরের চরআত্রা ও নওপাড়া এলাকায় ৫৫০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। নড়িয়া উপজেলা সদরে আরেকটি হাসপাতাল নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে।
২০১৯ সালের পর নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন থেমেছে। কিন্তু ২০ হাজার গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। গৃহহীন পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। কারও কারও আশ্রয় হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে। অনেকে বিভিন্ন ফসলি জমি ভাড়া নিয়ে ছাপড়া তুলে বসবাস করছে। সরেজমিনে ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নড়িয়ার বিভিন্ন সড়কের পাশে, ফসলি জমিতে ও বাগানে অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার জমি ভাড়া নিয়ে ছাপড়ায় বাস করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক চেয়ারম্যান বলেন, নদীভাঙনের পর অনেক পরিবারকে ঘর নির্মাণের টিন দেওয়া হয়েছিল। মানুষ তো জমি হারিয়েছে, জমি না পেলে তারা ঘর তুলবে কোথায়? স্থানীয় প্রশাসন গৃহহীনদের খাসজমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।
কেদারপুর ইউনিয়নের চরজুজিরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন রাজিব সরদার ও সালমা আক্তার দম্পতি। তাঁদের ১৫০ শতাংশ ফসলি জমি ও ৩০ শতাংশের বসতবাড়ি ছিল। কৃষিকাজ ও গবাদিপশুর খামার করে তাঁদের সংসার চলত। ২০১৫-১৮ সাল পর্যন্ত তিন দফা ভাঙনে তাঁদের ফসলি জমি ও বসতবাড়ি বিলীন হয়ে যায়।
রিনা আক্তার বলেন, ‘স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই ছিলাম। পদ্মার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরছি। স্বামী মাটি কাটার শ্রমিকের কাজ করেন। আর আমি গ্রামে ঘুরে সেলাইয়ের কাজ করি। পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।’
একই গ্রামের মুকুন্দ বাছার বলেন, ‘জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমন অসহায় হয়ে পড়ব, ভাবতেও পারিনি। কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায় না। আমাদের কথা ভাবে না। মরার পর একটু মাটিও পাব না।’
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাশেদুজ্জামান বলেন, ভাঙনে নিঃস্ব ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান বলেন, ‘নদীভাঙনে যাঁরা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। অনেককে খাসজমি দেওয়া হয়েছে। আর পদ্মা নদীর উত্তর তীরের চরআত্রা ও নওপাড়ায় অনেক খাসজমি রয়েছে। কেউ চাইলে সেখানে আমরা তাঁদের পুনর্বাসন করতে পারব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।