রবিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪২ হিজরি
রবিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

যুদ্ধের সময় অস্ত্রের দায়িত্বে থেকেও মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেনি রফিকুল

যুদ্ধের সময় অস্ত্রের দায়িত্বে থেকেও মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেনি রফিকুল
রফিকুল ইসলাম। ছবি-দৈনিক হুংকার।

গ্রুপ কমান্ড ছিলেন রফিকুল ইসলাম। জমা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধদের যুদ্ধ করার অস্ত্র। ছিলেন গ্রুপের অর্থ ও প্রশাসনিক দায়িত্বে। কিন্তু না জানা ও তথ্য প্রযুক্তির জ্ঞান না থাকায় আজও মুক্তিযোদ্ধের তালিকায় আসতে পারেননি ২নং সেক্টরের গোসাইরহাটের ডামুড্যার ১ টি গ্রুপ কমান্ডার মৃত আব্দুল কাদিরের ছেলে রফিকুল ইসলাম (৬৮)। এখন মৃত্যুর প্রহর ঘুনছেন। চাচ্ছে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় দাফন করা হক। তবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকা ভুক্তির জন্য কয়েকবার আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। পরে নিরুপায় হয়ে শিক্ষকতা করেই কাঁটিয়ে দিয়েছেন জীবন। তবুও মেলেনি মুক্তিযোদ্ধার সম্মান।
রফিকুল ইসলাম ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার আরশিনগর ইউনিয়নের মৃত আব্দুল কাদিরের ছেলে। যুদ্ধের সময় তিনি গোসাইহাটের একটি গ্রুপের কমান্ড ও গোসাইহাটের সকল মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্রের দায়িত্বে ছিলেন।
কাঁদতে কাঁদতে রফিকুল ইসলাম বলেন, ইন্টামিডিয়েট শেষ করে কুমিল্লা সার্ভে কলেজে ভর্তি অবস্থায় দেশে মুক্তিযোদ্ধ শুরু হয়। পরিবারের লোকজন বাঁধা দিবে এমন চিন্তা থেকে কাউকে না বলেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লিখানোর পর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় নোয়াখালী। সেখান থেকে নেয়া হয় ভারতের বাঘমারা ক্যাম্পে। সেখান থেকে অস্ত্র দিয়ে আমাদেরকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। ডামুড্যা-গোসাইরহাটে দায়িত্ব প্রাপ্ত কমান্ডার ইকবাল হোসেন বাচ্চু ছৈয়ালের অধীনে আমি যুদ্ধে অংশ নেই। সেখানে আমাকে একটি প্লটুনে কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা যখন অস্ত্র জমা দেই তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে আমাদের সনদ দেয়া হয়।
চোখের জল মুছতে মুছতে অবহেলিত এ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সনদ এখন উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু এখনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাইনি, সম্মান পাইনি। নিজের পরিবার পরিজন রেখে জীবন বাজি রেখে যে সগ্রাম করলাম তার বিনিময়ে এখন অবহেলা পাচ্ছি। আমার পরিবারে খবর কেউ রাখে না। বুকটা ফেঁটে যায়, যখন দেখি আমার সহযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। আমার হয়তো সে সৌভাগ্য হবে না।
তার সাথে য্দ্ধু করা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সাল ভারতের বাঘমারা ট্রেনিং সেন্টার থেকে রফিকুল ট্রেনিং নিয়ে বাংলাদেশে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তরুণ ও প্রতিভাবান হওয়ায় তাকে যুদ্ধের পাশাপাশি একটি গ্রুপের কমান্ডার ও ইউনিটের অস্ত্রের দায়িত্বে ছিলেন। যুদ্ধের পর বিয়ে করে অনেকটা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। পরে সখিপুর একটি প্রাইমারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক চাকরি করেন। শিক্ষক হলেও তিনি তথ্য প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে ছিলেন। রাখতেন না কোন খবর। কোন মুক্তিযোদ্ধার সাথে যোগাযোগ করেন নি। একা একা ই থাকতেন সেই সখিপুরে। গত ১৭ সালে যখন মুক্তিযোদ্ধার বাছাই হয়ে ছিল। তখন সে আসে কিন্তু অনলাইনে আবেদন না করার কারণে বাদ পড়ে যায়। তার সাথে থাকা মুক্তিযোদ্ধা আওতাভুক্ত হলেও তিনি হতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধ নিয়ে জেলার বীরমুক্তিযুদ্ধা দিদার মাস্টারের লেখা শরীয়তপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা বইয়ে তার নাম রয়েছে। এছাড়া আরোও অনেক মুক্তিযোদ্ধা কালীন বইতে নাম রয়েছে। তিনি মাদারীপুর গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন।
রফিকুলের সাথে যুদ্ধ ও ট্রেনিং করা বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশীদ বলেন, রফিকুল আমার সাথে ভারতে ট্রেনিং করেছে। আমি আর রফিক এক সাথে ট্রেনিং শেষ করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ও ছিল গোসাইহাটের সেক্টরে আমি ছিলাম ভেদরগঞ্জের আন্ডারে। আমার মনে আছে গত ১৭ সালে যখন বাছাই হয়েছে তখন সে উপজেলা অফিসের সামনে মাথা ঠেকিয়ে কান্না করছে। কিন্তু আমাদের কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই।
গোসাইরহাট যুদ্ধকালীন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেন বাচ্চু বলেন, রফিকুল ইসলাম ভারতে ট্রেনিং প্রাপ্ত একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমার এখানে প্লটুন কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া আমার এখানে অস্ত্র ও গোলাবারুদের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আজও তার নাম তালিকাভূক্ত হয়নি।
এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর আল নাসীফ বলেন, যদি ঐ ব্যক্তি আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। তাহলে যাচাই-বাছাই কমিটির তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।