মঙ্গলবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
মঙ্গলবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

চিকিৎসক মোহাব্বত আলমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

চিকিৎসক মোহাব্বত আলমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা
সাকমো মোহাব্বত আলম। ফাইল ফটো।

ডাক্তার পরিচয়দানকারী এক ভুয়া ডাক্তারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন লালচান নামে এক ব্যক্তি। ২৭ অক্টোবর শরীয়তপুরের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল এ্যাক্ট এবং দন্ড বিধি আইন লঙ্গনের অপরাধ এনে এই মামলা করেন। ডা. পরিচয়দানকারী মোহাব্বত আলম আসলে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সাকমো) মাত্র। তিনি ভেদরগঞ্জ উপজেলার তারাবুনিয়া ২০ শয্যা হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। নানান অপকর্ম ও দুর্নীতির দায়ে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। বিষয়টি তদন্ত করে শাস্তিমূলক বদলীও করেছেন কর্তৃপক্ষ। কোন কিছুতেই তার বেপরোয়া কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। মোহাব্বত আলমের অপকর্মের ফিরিস্তি তুলেধরে আদালতে মামলা হয়। এবার আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করেছেন।
মামলার আরজি সূত্রে জানাগেছে, গত ১১ আগস্ট সখিপুর থানার পূর্ব বালাকান্দি গ্রামের লালচান বেপারীর ৩ বছর বয়সী ছেলে জুনায়েদ বাড়ির উঠানে খেলাধুলা করছিল। সেখানে পড়ে গিয়ে জুনায়েদ কোমড়ে ব্যাথা পায়। তখন লালচান তার সন্তানকে দ্রুত ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানকার জরুরী বিভাগে দায়িত্বে থাকা সাকমো মোহাব্বত আলম তাদের সাথে ডাক্তার পরিচয়ে প্রথমে এক্স-রে করাতে বলে। পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বালার বাজারের সালমা মেডিকেল কর্ণারে অসুস্থ জুনায়েদকে নিয়ে যেতে বলে। সেখানে ৩০ হাজার টাকা চুক্তিতে জুনায়েদের চিকিৎসার কাজ শুরু করেন ওই কথিত ডাক্তার। শিশুর ক্ষতস্থান চিহ্নিত না করে প্রথমে পায়ের হাটুর নিচ থেকে হাটুর উপর পর্যন্ত প্লাষ্টার করে। ১ মাস পরে সেই প্লাষ্টার খুললে শিশুটি আর উঠে দাড়াতে পারে না। তখন ভুয়া চিকিৎক মোহাব্বত আলম জুনায়েদের বাবাকে বলে অনেক দিন বেঁধে রাখায় পায়ের ক্যালসিয়াম শুকিয়ে গেছে। তখন আবার ১ মাসের ক্যালসিয়াম ওষুধ লিখে দেয় সে। আরও একমাস ক্যালসিয়া খাইয়ে শিশুটির কোন পরিবর্তন না হওয়ায় আবার কথিত সেই ডাক্তারের কাছে শিশুটিকে নিয়ে আসে। তখন কথিত ডাক্তার পরিচয়দানকারী মোহাব্বত আলম শিশুটিকে পাশ্ববর্তী চাঁদপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এদিকে ২ মাস অতিবাহিত হওয়ায় শিশুটি প্রায় পঙ্গু হয়ে যায়। শিশুটিকে চাঁদপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার দ্রুত ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। কোন উপায়ন্ত না দেখে ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায় লালমিয়া দম্পতি। সেখান থেকে ডাক্তার জানিয়েছে এই চিকিৎসার জন্য কয়েক লাখ টাকার প্রয়োজন।
বাদী তার বক্তব্যে বলেন, আমি একজন রাজমিস্ত্রী। কাজ করলে দিনে ৪০০ টাকা হাজিরা পাই। কোনরকম স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলছিল। আমার ছেলে জুনায়েদ খেলতে গিয়ে কোমরে ব্যথা পায়। আমি তাৎক্ষনিক ভেদরগঞ্জে হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে যাই। তখন মোহাব্বত আলম ডাক্তার পরিচয় দিয়ে আমাদের কাছে আসে। প্রথমে একটা কাগজ লিখে দিয়ে এক্স-রে করাতে বলে এবং পরে বালার বাজারের সালমা মেডিসিন কর্ণারে যেতে বলে। সেখানে ৩০ হাজার টাকা চুক্তিতে আমার ছেলের চিকিৎসা শুরু করে। পরে আরও ১০ হাজার টাকা নেয়। অথচ ক্ষত স্থান বাদ দিয়ে ভালো স্থানে প্লাষ্টার করে দুই মাস অতিবাহিত করে। এরমধ্যে আমার ছেলের পায় অচল হয়ে যায়। পরে কথি ডাক্তারের পরামর্শে ছেলেকে চাঁদপুর নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসক এক্স-রে করিয়ে দেখে ক্ষতস্থানের কোন চিকিৎসাই করা হয় নাই। পরবর্তীতে এই চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি ছেলের বর্তমানে যে অবস্থা তার চিকিৎসা করতে কয়েক লাখ টাকার প্রয়োজন। তারপরেও আমার ছেলে হাটতে পারবেকিনা তার কোন নিশ্চয়তা নাই। বিষয়টি আমি কথিত ডাক্তার মোহাব্বত আলমকে জানালে আমার সাথে খুব খারাপ আচরণ করে বলে, ‘এই বিষয়ে তার কোন দায়দায়িত্ব নাই’। তাই নিরুপায় হয়ে আদালতের স্মরণাপন্ন হই। আদালত আমার আর্জি আমলে নিয়ে সেই ভূয়া ডাক্তারের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট দিয়েছে তাই আমি খুব খুশী হয়েছি। আশা করছি ন্যায় বিচার পাব।
বাদী পক্ষের আইনজীবী শহিদুল ইসলাম সজিব বলেন, বাদীর ৩ বছর বয়সী একমাত্র ছেলেকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে ডাক্তার পরিচয়দানকারী ভূয়া ডাক্তার সারা জীবনের জন্য পঙ্গু করে ফেলেছে। বাদী একজন দিনমজুর। আর্থিক ভাবে খুবই দুর্বল। আমার চেম্বারে এসে কান্নাকাটি করে। পরবর্তীতে আদালতে ভূয়া ডাক্তারকে আসামী করে মামলা করি। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা ইস্যু করেছে।
এই বিষযে সিভিল সার্জন ডা. এস.এম. আব্দুল্লাহ আল মুরাদ বলেন, এই বিষয়ে আমি এখনও কিছু জানি না। আমি বিষয়টি জানতে পারলে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহন করব।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারী মাসে কথিথ এই ডাক্তারের অনিয়ম ও দুর্নীতির ফিরিস্তি উল্লেখ করে স্থানীয় দৈনিক হুংকার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রথমে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. মেঘনাদ সাহা ও পরে সিভিল সার্জন দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটি তদন্তকালে পত্রিকায় প্রকাশিত বিষয়ের সত্যতা পায়। সেই ভাবেই প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কমিটি। ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক বদলিও করেছে তাকে।


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।