বৃহস্পতিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
বৃহস্পতিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

এ সময়ের দান সদকাহ

এ সময়ের দান সদকাহ
এ সময়ের দান সদকাহ

ইসলামে দান সদকার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। রাসূল সা: ও তাঁর সাহাবাদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দান সদকা ছিল তাদের অপরিহার্য আমল। ইসলামের অগ্রযাত্রায় এ দান সদকার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। দান সদকাহ যেমন সুবিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে, তেমনি সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করেছে। ইসলাম সর্বদাই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে দায়িত্বানুভূতি নিয়ে মানবিকতার সাথে। সম্পদের অহংবোধ, প্রভুত্ব বা লৌকিকতার জন্য দান করা ইসলামের শিষ্টাচারবহির্ভূত।
দান করা গরিবের প্রতি অনুগ্রহ নয়, বরং আমাদের দায়িত্বÑ এই মনোভাব নিয়ে দান করতে হবে। বর্তমানে করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তৃতির ফলে সারা পৃথিবীতেই অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত সব শ্রেণীর মাঝেই এর প্রভাব পড়েছে। এ সময় মানুষকে দান করার মাধ্যমে যেমন সওয়াব অর্জন করা যাবে, তেমনি এই বিপদ থেকেও উদ্ধার হওয়া যাবে। তাই এ সময় অভাব থাকা সত্ত্বেও আমাদের দান করা উচিত। আল্লøাহ বলেন, ‘আর যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে দান করে ও ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎ কর্মশীলদের ভালোবাসেন (আলে ইমরান ১৩৪)। অর্থাৎ যখন সম্পদের প্রাচুর্যতা থাকে শুধু তখনই দান করব, যখন সম্পদ কম থাকবে তখন দান করব নাÑ এমনটি হওয়া উচিত নয়, বরং দান সর্বাবস্থায় অব্যাহত রাখা উচিত। আল্লাহ এর মাধ্যমে রোগ-বালাই ও বিপদ-আপদ উঠিয়ে নেন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দান করেন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি দান করতে থাকো, আমিও তোমাকে দান করব’ (বুখারি ৫৩৫২)। আর যদি আমরা কৃপণতা করে বসে থাকি এবং চিন্তা করি সময় একটু ভালো হলে দান করব অথবা রমজানে দান করলে যেহেতু বেশি সওয়াব, তাহলে তখনই দান করব, সেটি অনেক ক্ষেত্রে ভুল ধারণা হতে পারে।
এমনো হতে পারে আমার হায়াত দান করব করব করেই শেষ হয়ে গেল, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবো। সম্প্রতি ইতালির এক ব্যক্তিকে তার টাকাগুলো রাস্তায় ছড়িয়ে দিতে দেখা গেছে। কেননা তার পরিবারের ১২ জন সদস্যই মারা গেছে। এখন তার সম্পদ ব্যয় করার মতো কেউ বেঁচে নেই। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো সেদিন আসার পূর্বে, যেদিন থাকবে না কোনো বেচাকেনা, কোনো বন্ধুত্ব, না কোনো সুপারিশ’ (বাকারা ২৫৪)। আবার দান না করায় আল্লাহ সম্পদ কেড়ে নিতে পারেন। তাই আমাদের এ মুহূর্তে বেশি বেশি দান করা প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
হাদিসে এসেছে, ‘এক ব্যক্তি রাসূল সা:-কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল সা:! কোন দান ফলাফলের দিক থেকে সর্বোত্তম? রাসূল সা: বললেন, তোমার সুস্থ ও উপার্জনক্ষম অবস্থায় দান। যখন তোমার দরিদ্র হওয়ারও ভয় থাকে এবং ধনী হওয়ারও আশা থাকে (বুখারি ১৪১৯)। অর্থাৎ মনে ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা কিন্তু বাস্তবে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে এমন সময়ের দানই সর্বোত্তম। বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও ঠিক তাই। তাই এখন আমাদের দান করার মোক্ষম সময়। বাংলাদেশসহ সারা বিশে^ই বর্তমানে উচ্চবিত্তরা নি¤œবিত্তদের সাহায্য করছেন। সরকারি বেসরকারিভাবেও সাহায্য সহযোগিতা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সবশ্রেণীর মানুষই প্রত্যেকের অবস্থান থেকে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো অবশ্যই সওয়াবের কাজ।
কিন্তু এসবের মাঝে আমাদের দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে একশ্রেণীর মানুষ, যাদের দিকেও সাহায্যের হাত সম্প্রসারণ করা উচিত। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদের কথাও বাদ দেননি। আল্লাহ বলেন, ‘ব্যয় করুন এমন অভাবগ্রস্তদের জন্য যাদের আল্লাহর পথে এমনভাবে আবদ্ধ করা হয়েছে যে, তারা জমিনে জীবিকা সংগ্রহের জন্য বেরুতে পারে না। না চাওয়ার কারণে অজ্ঞরা তাদের অভাবমুক্ত মনে করে। তাদের লক্ষণেই তুমি তাদের চিনতে পারবে। তারা মানুষের কাছে মিনতিসহকারে কিছু চায় না। আর তোমরা এদের জন্য উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো’ (বাকারা ২৭৩)। ইসলামের সামাজিক নীতি কতটা ভারসাম্যপূর্ণ তা এই আয়াত থেকেই বুঝা যায়। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে দরিদ্ররা নানাভাবে সাহায্য পাচ্ছেন। তারা নিজেরা আবেদন করে হলেও ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করছেন। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছেন, যাদের ঘরে খাবার নেই অথচ কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। না, পারছেন কিছু করতে, না পারছেন কাউকে কিছু বলতে, আর না পারছেন সইতে। আবার লোকলজ্জার ভয়ে ত্রাণ ও সংগ্রহ করতে পারছেন না। তারা তাদের সম্মান ও ব্যক্তিত্বের কারণে কখনো কারো কাছে কিছু চায় না। মহান আল্লাহ তায়ালা এদের শুধু দানই করতে বলেননি বরং উৎকৃষ্ট বস্তু দান করতে বলেছেন। হজরত আবু বকর রা:, হজরত ওমর রা: যেমন রাতের আঁধারে বেরিয়ে যেতেন জনপদে, ঘুরে ফিরে দেখতেন মানুষের অবস্থা, অনাহারী মানুষকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন, নিজের পিঠে খাদ্যের বোঝা নিয়ে পৌঁছে দিতেন দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে, আমাদেরও উচিত এ ধরনের মানুষকে নিজে থেকে খুঁজে বের করে যথাসম্ভব সাহায্য করা। তাহলে আমরা অনাকাক্সিক্ষতভাবে হয়ে যাওয়া লৌকিকতা থেকেও রক্ষা পাবো। অর্জন করতে পারব আল্লাহর সন্তুষ্টি। সমাজে ফিরে আসবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য, থাকবে না উঁচুনিচু বিভেদ, বিরাজ করবে শান্তি ভালোবাসা। আল্লাহ আমাদের দানের হাত প্রশস্ত করার তাওফিক দান করুন এবং করোনাসহ সব বিপদাপদ থেকে সবাইকে রক্ষা করুন। আমিন।
লেখক : খতিব, জান্নাতুল মাওয়া জামে মসজিদ, গাজীপুর


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।