বৃহস্পতিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
বৃহস্পতিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
বন্যা ও নদী ভাঙনে দিশেহারা লাখো মানুষ

শরীয়তপুরে বানভাসী মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছেন স্থানীয় সাংসদ

বন্যা দূর্গতদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দিচ্ছেন শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপু। ছবি-দৈনিক হুংকার।

দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে নেমে আসা উজানের পানি ও টানা বর্ষনে শরীয়তপুর জেলার পদ্মা নদী বেষ্টিত এলাকায় দেখা দিয়েছে বন্যা। বানের পানির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদী ভাঙ্গন। গত দশ দিনে বন্যার পানি ঢুকে জেলার ৬ উপজেলার ৪৮টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার তিন শতাধিক গ্রামে পানি বন্দি হয়েছে অন্তত ৬০ হাজার পরিবার। ইতিমধ্যে নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে বসত বাড়ি ও ফসলী জমি হারিয়েছে চার শতাধিক পরিবার। বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে দিশেহারা হয়ে পরেছে নদী তীরবর্তী লাখো মানুষ। শিশু, বৃদ্ধ ও গবাদীপশু নিয়ে দুর্বিপাকে পরেছেন তারা। নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পরেছে দুর্গত এলাকায়। দূর্গতদের ঘরে ঘরে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা। ২৯৮টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে জেলা প্রশাসক।
জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই শরীয়তপুর জেলার জাজিরা, নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার পালেরচর, বড়কান্দি, বিলাশপুর, কুন্ডেরচর, জাজিরা, পূর্বনাওডোবা, চরআত্রা, নওপাড়া, ঘড়িসার, কেদারপুর, চরভাগা ও উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে পদ্মা নদী তীরবর্তী এলাকায় নদী ভাঙ্গন শুরু হয়। নদী ভাঙ্গনের সাথে সাথে বাড়তে থাকে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি। চোখের পলকে নদী বক্ষে বিলীন হয় তারাবুনিয়া ষ্টেশন বাজারের অন্তত ২৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। জাজিরা উপজেলার পদ্মা নদীর দীপাঞ্চল খ্যাত পালেরচর, বড়কান্দি ও কুন্ডেরচর ইউনিয়নের কলিকাল, সিটারচর, বাবুরচর ও বাগানবাড়ি এলাকায় তিন শতাধিক মানুষের বসত বাড়ি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়। এছারাও পদ্মার শাখা নদী কীর্তিনাশা নদীর ভাঙ্গনের শিকার হয়ে নড়িয়া ও শরীয়তপুর সদর উপজেলার শতাধিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদী ভাঙ্গনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে জোয়ারের পানি। বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পদ্মা নদীর পানি বিপসীমার ৩০-৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় শরীয়তপুরের জেলার প্রধান সড়কটি সহ কয়েকটি আঞ্চলিক সড়ক প্লাবিত হয়ে শরীয়তপুর-ঢাকা, শরীয়তপুর-চাঁদপুর ও নড়িয়া-জাজিরা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শরীয়তপুরের তিনটি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার মধ্যে শরীয়তপুর-১ ও শরীয়তপুর-২ নির্বাচনী এলাকা অধিক মাত্রায় বন্যা ও ভাঙ্গল কবলিত হয়েছে।
শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার পর্যন্ত জেলার ৬৫ ইউনিয়নের মধ্যে ৪৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় প্রায় ৬০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। সরকারি হিসেবে নদী ভাঙ্গনে গৃহহীন হয়েছে ২৩৬ পরিবার। সাড়ে ১২ লাখ নগদ টাকা, ৬শত ৫০ মে.টন জি.আর এর চাউল, ২ লাখ টাকার শিশু খাদ্য, ৪ লাখ টাকার গোখাদ্য, ১৫টি আইটেম সমেত ৪ হাজার প্যাকেট শুকনা খাদ্য, ১ শতটি পরিবারের জন্য ১ শত বান্ডেল ঢেউ টিন ও ৩ হাজার করে নগদ ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৪০ হাজার ৭ শত পরিবারের মাঝে ৪ শত ৭০ মে.টন চাল সহ অন্যান্য সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম এবং শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপু বানভাসী মানুষকে ত্রান সহায়তা করছেন। তবে, পানি সম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম ও সাংসদ ইকবাল হোসেন অপু দুর্গত এলাকায় ঘুরে ঘুরে অসহায় মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছেন।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, জেলার ৬৫টি ইউনিয়নের মধ্যে বন্যা কবলিত ৪৮টি ইউনিয়নই হলো, জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডুবা, পালেরচর, বড়কান্দি, জাজিরা, বিলাশপুর, কুন্ডেরচর, বিকে নগর, সেনেরচর, জয়নগর, মূলনা, গোপালপুর, সদর উপজেলার ডোমসার, চন্দ্রপুর, মাহমুদপুর, বিনোদপুর, পালং, আঙ্গারিয়া, চিতলিয়া, শৌলপাড়া, চিকন্দী ও রুদ্রকর ইউনিয়ন, নড়িয়া উপজেলার, মোক্তারের চর, চরআত্রা, নওপাড়া, ঘড়িসার, কেদারপুর, রাজনগর, জপসা, ভোজেশ্বর, ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাচিকাটা, চরভাগা, সখিপুর, তারাবুনিয়া, উত্তর তারাবুনিয়া, চরসেন্সাস, আর্শিনগর, রামভদ্রপুর, ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা, ধানকাটি, সিঁধলকুড়া, ইসলামপুর, দারুল আমান এবং গোসাইরহাট উপজেলার গোসাইরহাট, কুচাইপট্টি, কোদালপুর, আলাওলপুর, নলমুড়ি, নাগেরপাড়া ও ইদিলপুর সহ অন্যান্য ইউনিয়ন। এ ছারাও শরীয়তপুর পৌরসভা ও নড়িয়া পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পািনতে প্লাবিত হয়েছে। শত শত মানুষের ঘরে পানি ঢুকেছে। এলাকার সংযোগ সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গিয়ে চলাচলে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
সাম্প্রতিক নদী ভাঙ্গনে ভিটে বাড়ি হারানো জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ও পালেরচর ইউনিয়নের ফজলু সরদার, আলী আকবর সরদার, মোস্তফা মোল্যা, আব্দুল আলী সারেং, হাবিব সারেং, নুরু সরদার, আবু তাহের সরদার ও আবুল কালাম ফকির জানান, তাদের বসত বাড়ি ইতিমধ্যে নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার তারা নদী ভাঙ্গনের কবলে পরে সর্বস্ব হারিয়েছেন। কোন ত্রান নয়, নদী ভাঙ্গন থেকে বাঁচতে স্থায়ী বাধ নির্মাণের জন্য তারা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
পালেরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন বেপারী বলেন, যুগের পর যুগ নদী ভাঙ্গনের কবলে পরে পালেরচর ইউনিয়নের তিন-চতুর্থাংশ ইতিমধ্যে পদ্মা গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মা নদীর মাঝখানে অবস্থিত তিনটি চর সিটারচর, বাবুরচর ও বাগান বাড়ি এলাকায় এ বছর ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গনের সাথে বন্যার পানি প্রত্যেকটি বাড়িতে ঢুকে পরেছে। ৬০টি পরিবারের জন্য নির্মিত সিটারচর গুচ্ছগ্রামটি ভাঙ্গনের মুখে পরায় সেখানকার ঘরবাড়ি সড়িয়ে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।
জাজিরা ইউনিয়রে চেয়ারম্যান এস,এম রফিকুল ইসলাম বলেন, তার এলাকায় আড়াই হাজার পরিবার বন্যার পানিতে আটকে গিয়েছে। ইতিমধ্যে শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপু ১ হাজার ৩ শত পরিবারকে ১০ কেজি করে ত্রানের চাল বিতরণ করেছেন।
বড়কান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সরদার বলেন, গত সপ্তাহে বড়কান্দি ইউনিয়নের ১৭টি পরিবারের বসতবাড়ি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক পরিবার। বর্তমানে নদী ভাঙ্গনের সাথে বন্যার পানি মানুষকে অধিক সমস্যায় ফেলেছে।
জেলা ত্রান ও দুর্যোগ বিষয়ক কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. আছাদুল হক জানান, জেলার ৬৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪৮টি ইউনিয়ন এবং ৬টি পৌরসভার মধ্যে ২টি পৌরসভা বন্যা কবলিত হয়েছে। ইতমধ্যে ২৯৮টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে দুর্গত মানুষের জন্য। ত্রান সহায়তা হিসেবে যে নগদ টাকা, চাল, শিশু খাদ্য, গোখাদ্য, শুকনা খাদ্য ও ঢেউ টিন পাওয়া গেছে তা বিতরণ করা হচ্ছে। একজন লোকও যাতে অনাহারে না থাকেন সে জন্য সরকারের সকল প্রস্তুতি রয়েছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম আহসান হাবিব বলেন, ৪৮০ সেন্টি মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে শরীয়তপুর পদ্মা নদীর সুরেশ্বর পয়েন্টে। গড়ে ৩০ থেকে ৪০ সেন্টি মিটার বিপদ সীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ২৭ জুলাই পর্যন্ত পানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, এবছর নদী ভাঙ্গনের তীব্রতা অনেক। বন্যার লেভেল, পানির লেভেল এবং পানির স্রোত অনেক বেশী থাকায় সমস্যা প্রকট হচ্ছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বন্যা এবং নদী ভাঙ্গনের কারনে জরুরী রক্ষনা বেক্ষনের জন্য সরকার থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং দ্রুত কাজ চলছে।
শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপু বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকার জাজিরা উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন পদ্মা নদীর ভাঙ্গন কবলিত। এবছরও নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এছারাও সদর উপজেলায় কীর্তিনাশা নদীর ভাঙ্গনে অনেক বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদী ভাঙ্গনের সাথে শুরু হয়েছে প্রবল বন্যা। ইতিমধ্যে ২২ হাজার পরিবারের কাছে সরকারি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়েছি। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর জাজিরা পয়েন্ট থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পেতে পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম এবং আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় একটি রিভার ড্রাইভ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহন করেছি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের মানুষের শত বছরের নদী ভাঙ্গনের সমস্যার সমাধান হবে। তিনি আরো বলেন, শরীয়তপুর সদর উপজেলার কোটাপাড়া মোড় থেকে মাদারীপুরের রাজারচর পর্যন্ত কীর্তিনাশার দুই তীরে সাড়ে ৩ শত কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মান ও সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পটি মন্ত্রনালয়ে আর্থিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চলমান বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত একজন মানুষকেও অভুক্ত থাকতে দেয়া হবেনা ।


error: দৈনিক হুংকারে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।